বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প একনেকে উঠছে মঙ্গলবার

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণে নেওয়া প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি অবশেষে আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উঠছে।

রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক সোমবার দুপুরে এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত প্রকল্পটি মঙ্গলবার অনুমোদন পেতে পারে।

বহুপ্রতীক্ষিত বড় ওই প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত অনুমোদনের জন্য একনেকে তোলার খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বগুড়া চেম্বার অব কমার্স নেতৃবৃন্দ। তারা বলছেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ শুধু দুই জেলার জন্যই নয়; বরং পুরো উত্তরাঞ্চলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হবে।

বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে আন্দোলনও হয়েছে অনেক। ওই দুই জেলার মধ্যে সরাসরি রেলপথ না থাকায় এ অঞ্চলের ট্রেনগুলোকে বর্তমানে সান্তাহার, নাটোর ও পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার ঘুরপথে চলাচল করতে হচ্ছে। বাড়তি ওই পথ ঘুরতে একদিকে যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে, তেমনি গুনতে হচ্ছে বেশি ভাড়াও। বগুড়া থেকে যেখানে সড়ক পথে ঢাকা পৌঁছাতে লাগে ৮ ঘণ্টা, সেখানে ট্রেনে ঘুরপথে যেতে লাগে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা।

২০০৫ সালের মাঝামাঝি বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে প্রথম একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে রেলপথ নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে জমি অধিগ্রহণের জন্য সে সময় প্রাথমিক জরিপও চালানো হয়। তবে বগুড়া থেকে নির্বাচিত তৎকালীন বিএনপিদলীয় প্রভাবশালী এক সাংসদের (পরিবহন ব্যবসায়ী) নানামুখী বাধার কারণে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।

এর প্রায় ছয় বছর পর ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল সিরাজগঞ্জে এক জনসভায় ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনে প্রতিশ্রুতি দেন। তারপর নতুন করে চিঠি চালাচালি শুরু হয়। আশায় বুক বাঁধেন দুই জেলার মানুষ; কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই তৎপরতা ঝিমিয়ে পড়ে। ফলে আবারও শুরু হয় আন্দোলন।

উত্তরাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দাবিতে নতুন করে সোচ্চার হয়ে ওঠেন দুই জেলার মানুষ। ফলে ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় দলীয় এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পুরনো প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।

কিন্তু অর্থের কোনো সংস্থান করতে না পারায় প্রকল্পটি এতদিন ফাইলবন্দি হয়েই পড়ে ছিল। তবে ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশে যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তৃতীয় ক্রেডিট লাইনের (এলওসি) বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণে ঋণ দিতে সম্মত হয়।

মূলত তার পরপরই গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফাইল (ডিপিপি) প্রণয়নসহ নকশা তৈরি, স্টেশনের সংখ্যা নির্ধারণ এবং রেলপথ নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমির মূল্য নির্ধারণের কাজও চূড়ান্ত করা হয়।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় ডুয়েল গেজের দুটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি হলো- বগুড়া স্টেশন থেকে আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে ছোট বেলাইল এলাকা হয়ে সিরাজগঞ্জের এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটার এবং অন্যটি বগুড়ার কাহালু স্টেশন থেকে রানীরহাট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার রেলপথ। এজন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

মূলত সান্তাহারের দিক থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে সান্তাহার হয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুরগামী ট্রেনগুলো যাতে বগুড়া স্টেশনকে এড়িয়ে সরাসরি চলাচল করতে পারে সেজন্য কাহালু-রানীরহাট রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

দুটি রেলপথ মিলিত হওয়ার কারণে বগুড়া শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে রানীরহাটে একটি জংশনও নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া নতুন ওই রেলপথে আরও পাঁচটি স্টেশন স্থাপন করা হবে। এগুলো হলো- শেরপুর, চান্দাইকোনা, রায়গঞ্জ, কৃষাণদিয়া ও সদানন্দপুর। প্রস্তাবিত ৮৪ কিলোমিটার রেলপথের জন্য মোট ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়ার সীমানায় ৫২ কিলোমিটার রেলপথের জন্য ৫১০ একর এবং সিরাজগঞ্জ অংশের ৩২ কিলোমিটার অংশের জন্য ৪৫০ একর।

রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক বলেন, ‘রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এখন একনেকের অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করা হবে।’

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন বলেন, ‘আমরা আশা করি, একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদনের মাধ্যমে সেটির নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু হবে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ১০ জেলার সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত ও সহজ হবে। এতে সার্বিকভাবে চাঙ্গা হবে এ অঞ্চলের অর্থনীতিও।

অনুসন্ধান

পুরাতন খবর

এই বিষয়ের আরো খবর

© All rights reserved © 2017 ThemesBazar.Com

Desing & Developed BY লিমন কবির