মা-বাবা এমন নিষ্ঠুরও হয়!

নির্যাতিত শিশুর কথা শুনে তার বাড়ির রাস্তায় দাঁড়াতেই প্রতিবেশী শিরিনা নাহার, জহুরা, আছিয়া খাতুন, বাকুল মণ্ডল, সালমা খাতুনসহ একে একে ছুটে এলেন জনা পঞ্চাশেক নারী-পুরুষ। সবাই বলাবলি করছে মা-বাবা কি এমন নিষ্ঠুর হতে পারে! বর্ণনা দিলেন শিশু মো. মাহিম হোসেনের (৮) ওপর নিষ্ঠুর বাবা-মার লোমহর্ষক নির্যাতনের কাহিনী। কখনও মুখে বালিশ চেপে, আবার কখনও মুখ বেঁধে নির্যাতন করা হয় তাকে। নির্যাতনের সময় থাকে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ। শরীরের প্রতি ইঞ্চিতে নির্যাতনের দাগ। একজন হাঁপিয়ে উঠলে আরেকজন মারেন। একটু শব্দ করলে গরম খুন্তি চেপে ধরেন মুখে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকেও শুনতে হয় অকথ্য গালাগাল।

এমন নিষ্ঠুর বাবা-মা হলেন ঝিনাইদহের শৈলকূপার পৌর এলাকার কবিরপুরের বেসরকারি সংস্থা আশা কার্যালয়ের অফিস সহকারী মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী মিরা খাতুন। নির্যাতিত মাহিম মতিউরের একমাত্র সন্তান হাবিবপুর সানু কিন্ডারগার্টেনের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। মাহিম এবার কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন বৃত্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ঝিনাইদহ জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

প্রতিবেশীরা জানায়, দেড় বছর ধরে এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিশুটি। সর্বশেষ সোমবার দুপুরে শিশুটির ওপর নির্যাতন সইতে না পেরে প্রতিবেশীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং বাবা-মাকে গণপিটুনি দেয়। এরপর অবস্থা বেগতিক হলে সন্তান রেখে তারা আত্মগোপনে চলে যায়। পরে শিশুটিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেপে ভর্তি করা হয়। এরপর এনজিও আশা কার্যালয়ের শাখা ব্যবস্থাপক বজলুর রহমান শিশুটিকে দায়িত্ব নিয়ে চিকিৎসা শেষে অফিসে নিয়ে আসেন।

মতিউরের প্রতিবেশী শিরিনা নাহার বলেন, মতিউর হাবিবপুর চরে ভাড়া বাসায় থাকে। প্রতিবেশী হলেও শিশু সন্তানের ওপর নিষ্ঠুর বাবা-মার এ নির্যাতন সহ্য করা দায়। দেড় বছরের এমন কোনো দিন নেই যেদিন শিশুটির ওপর তারা নির্যাতন করেনি। নির্যাতনের সময় কান্না যেন বাইরে না যায় সে জন্য মুখে কাপড় বেঁধে নেয়। আবার কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে তারা। শিশু মাহিম তাদের সন্তান কি-না এ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন শিরিনা নাহার।

মতিউরের পাশের রুমের ভাড়াটিয়া রেশমা খাতুন বলেন, এমন কোনো দিন নেই যে, শিশুটির ওপর নির্যাতন করেনি তার বাবা-মা।

কবিরপুরের আশা অফিসে বাবা-মার নির্যাতনের শিকার মাহিমকে দেখতে গেলে সেও নির্যাতনের কথা জানায়।

আশার শাখা ব্যবস্থাপক বজলুর রহমান বলেন, মতিউর তার অফিসের অফিস সহকারী। বাবা-মা হয়ে কীভাবে শিশুটির ওপর এমন নির্যাতন করতে পারে- এ ঘটনায় তিনি হতবাক।

তিনি আরও বলেন, তারা কয়েকবার ডেকে সতর্ক করেছেন। সোমবার নির্যাতনের পর প্রতিবেশীরা শিশু মাহিমকে নিয়ে এলে তিনি দায়িত্ব নিয়ে তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে আবার অফিসে নিয়ে আসেন।

হাবিবপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন জানান, কোনো সুস্থ বাবা-মা শিশু সন্তানের ওপর এমন নির্যাতন করতে পারে না। হয়তো তারা দু’জন মাদকাসক্ত। বাবা-মার নির্যাতনের হাত থেকে শিশুটিকে বাঁচাতে অনেকে এমন মেধাবী ছেলেকে দত্তক নিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন।

সানু কিন্ডারগার্টেনের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মাহিমের শরীরের প্রতি ইঞ্চিতে আঘাতের চিহ্ন। বাবা-মা সন্তানের ওপর এমন নির্যাতন করতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

সানু কিন্ডারগার্টেনের পরিচালক সালমা খাতুন বলেন, এমন বাবা-মার বিচার হওয়া উচিত। প্রতিদিন মাথায় অথবা শরীরে কোনো না কোনো আঘাতের চিহ্ন থাকে মাহিমের। জিজ্ঞাসা করলে তার বাবা-মা প্রতিবেশীর সন্তানদের দোষ দিয়ে নির্যাতন ঢাকার চেষ্টা করে।

শৈলকূপা থানার ওসি কাজী আইয়ুবুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

শিশুটির বাবা-মায়ের সাথে কথা বলার জন্য তাদের বাড়িতে এ প্রতিবেদক গেলে কাউকে পাওয়া যায়নি। আশার শাখা ব্যবস্থাপক বজলুর রহমান বলেন, ঘটনার পর থেকে বাবা-মা পলাতক।

অনুসন্ধান

পুরাতন খবর

এই বিষয়ের আরো খবর

© All rights reserved © 2017 ThemesBazar.Com

Desing & Developed BY লিমন কবির