বিদেশি অবৈধ সুতা, কাপড়ের দাপটে মার খাচ্ছে দেশি বস্ত্র

রফতানিমুখী তৈরি পোশাক উৎপাদনে ব্যবহার করা সুতা কিংবা কাপড় আমদানিতে কোনো ধরনের শুল্ক্ক দিতে হয় না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে বন্ড লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই শুল্ক্কমুক্ত এই আমদানির সুবিধা পেয়ে থাকে। এর বাইরে দেশীয় বাজারের জন্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সুতা-কাপড় আমদানিতে গড়ে ৬২ শতাংশ শুল্ক্কারোপ রয়েছে। বন্ড লাইসেন্স অপব্যবহারের মাধ্যমে এই পরিমাণ শুল্ক্ক ফাঁকি দিয়ে বাজার দখলে নিয়েছে অবৈধ সুতা এবং কাপড়। এতে একদিকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে বিপর্যয়ের কবলে পড়ছে দেশীয় বস্ত্রশিল্প।

এনবিআরের তথ্য মতে, গত ছয় মাসে বাণিজ্যিক সুতা এবং কাপড় আমদানি বলতে গেলে হয়নি। অথচ বিদেশি সুতা-কাপড়ে দেশীয় বাজার সয়লাব। হাত বাড়ালেই বিদেশি কাপড় এবং সুতা পাওয়া যাচ্ছে। শুল্ক্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে আনা সুতা-কাপড়েই চলছে দেশীয় বাজার। দামে সস্তা হওয়ায় বিদেশি কাপড়ের প্রতিই পাইকারি ক্রেতাদের ঝোঁক। কারণ, তুলা আমদানি করে দেশে উৎপাদিত সুতা কিংবা সুতা আমদানি করে উৎপাদিত কাপড়ের দাম সঙ্গত কারণেই একটু বেশি। এতে দেশি সুতা-কাপড় বেচা-বিক্রি একরকম বন্ধ।

বস্ত্র কল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাজারের জন্য উৎপাদিত সুতা-কাপড় অবিক্রীত পড়ে আছে গুদামে। অবিক্রীত এই দুই পণ্যের দাম অন্তত ১৫ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলার কারণে বাধ্য হয়ে এখন উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে সুতা-কাপড় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। সাধারণত স্থানীয় বাজারের জন্য ঈদের আগের তিন মাসকে ভরা মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। আসছে ঈদ সামনে রেখে এ অবস্থা এখন চরম আকার নিয়েছে। ফলে বিদেশি অবৈধ সুতা-কাপড়ের দাপটে মার খাচ্ছে দেশীয় তাঁত ও বস্ত্রশিল্প।

এ পরিস্থিতির প্রতিকার চেয়ে এনবিআর এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে চিঠি দিয়েছে বিটিএমএ। এনবিআরকে বিষয়টি জানানোর পর কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ হয়নি। চিঠিতে পরিস্থিতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকৃত ঘোষণার ভিত্তিতে সুতা ও কাপড় আমদানির পর খালাস, আমদানি পর্যায়ে সুতা-কাপড়ের বাস্তবভিত্তিক শুল্ক্ক নির্ধারণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া বন্ড সুবিধা অর্থাৎ শুল্ক্কমুক্ত সুবিধায় আনা সুতা-কাপড়ের মোড়কে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকতে হবে ‘রফতানি পণ্য তৈরিতে ব্যবহারের জন্য এবং বিক্রির জন্য নয়।’ আমদানি পর্যায়ে এরকম কিছু পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেওয়া হয় চিঠিতে।

জানতে চাইলে বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন সমকালকে বলেন, শুল্ক্কমুক্ত আমদানি সুবিধার অপব্যবহারের কারণে দেশে এক লাখের মতো তাঁতের মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ এখন বন্ধ। রফতানিমুখী সুতা এবং কাপড় উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত মিলগুলোও চোরাই পথে আমদানি করা সুতার কারসাজিতে বিপদে পড়েছে। এসব কারণে উৎপাদন ক্ষমতার ৬০ শতাংশ কমিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে সংশ্নিষ্ট মিলগুলো। তিনি জানান, ২০টির মতো প্রতিষ্ঠান এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। তবে কোনো মিলের নাম উল্লেখ করতে রাজি হননি তিনি।

এছাড়া বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ। অথচ তাদের বন্ড লাইসেন্স ব্যবহার করেও আমদানি চলছে। সাধারণত রোজার ঈদ সামনে রেখে সুতা এবং কাপড় তৈরির মিলগুলো উৎপাদনমুখর থাকে। কিন্তু শুল্ক্কমুক্ত আমদানির অপব্যবহারের কারণে এ বছর মিলগুলোর সব কার্যক্রম স্থবির। তিনি বলেন, দেশীয় বস্ত্রশিল্প রক্ষায় সরকার কঠোর না হলে বিদেশি বস্ত্রের বাজারে পরিণত হবে দেশ। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হবে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হবে।

রফতানিমুখী পোশাক উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বস্ত্রের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ১৭ কোটি মানুষের বস্ত্রের চাহিদা পূরণ করে আসছে বিটিএমএর কারখানাগুলো। গত বেশ কিছু দিন ধরে বিদেশি কাপড়, শাড়ি, সালোয়ার-কামিজসহ সব চাহিদার সব ধরনের বস্ত্র অবৈধ অনুপ্রবেশ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। শুল্ক্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে আমদানি করা এসব পণ্য বাজারজাত হচ্ছে। সরকারকে ভ্যাট, ট্যাক্স দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় স্থানীয় মিলে উৎপাদিত সুতা-কাপড় চোরাই বিদেশি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। বিশেষ করে দুই ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছরের মতো এ বছরও স্থানীয় পোশাক বাজার শুল্ক্ক ফাঁকি দিয়ে আনা কাপড়ের দখলে চলে যাচ্ছে। এই দুই উৎসবে পোশাকের বাজার ৩০ হাজার কোটি টাকার। এতে বিশাল অঙ্কের অর্থ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ স্থানীয় মিলগুলো বন্ধ হচ্ছে।

বন্ড লাইসেন্সের অপব্যবহার কীভাবে হচ্ছে তার ব্যাখ্যায় নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একজন উদ্যোক্তা সমকালকে জানান, রফতানিমুখী তৈরি পোশাক রফতানিকারকের বন্ড লাইসেন্সের বিপরীতে শতভাগ শুল্ক্কমুক্ত সুবিধায় কাপড় আমদানি করছেন অসাধু কিছু ব্যবসায়ী। সেটা স্থানীয় বাজারে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে সংশ্নিষ্ট বন্ড লাইসেন্সধারী রফতানিকারক এবং শুল্ক্ক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান সমকালকে বলেন, এরকম কোনো ফাঁকির সুযোগ নেই। তারপরও কেউ একরম অন্যায় করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হোক। দায়ী কোনো উদ্যোক্তার পক্ষ নেবেনা বিজিএমইএ।

কার্যকর তদারকি জোরদার করলেই বন্ড লাইসেন্সের অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া বাজারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশি অভিযান চালানো, সীমান্ত হাটের ওপর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং শুল্ক্ক কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারির কথা বলেছেন তারা।

অনুসন্ধান

পুরাতন খবর

এই বিষয়ের আরো খবর

© All rights reserved © 2017 ThemesBazar.Com

Desing & Developed BY লিমন কবির